সোনাগাজীতে উপমহাদেশের প্রখ্যাত এক আলেমের বিদায় জানাজায় শোকার্ত মানুষের ঢল

আপডেট : December, 5, 2016, 4:29 am

জাবেদ হোসাইন মামুন ->>>
ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম ইসলামী বিদ্যাপীঠ দরুল উলুম আল হোছাইনিয়া ওলামা বাজার মাদ্রাসার মুহতামিম হক্কানী আলেম হযরত মাও. ছায়্যেদ আহমদের নামাজে জানাজা শেষে রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে দাফন করা হয়েছে। তার প্রিয় কর্মস্থলের দক্ষিণ পাশে মসজিদের সামনের কবরাস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়েছে। প্রায় দেড় লাখ শোকাতুর মুসল্লির উপস্থিতিতে তার জানাজার নামাজ সম্পন্ন হয়। জানাজার নামাজ পড়ান তার সহকর্মী এবং ওই মাদ্রাসার নবনিযুক্ত মুহ্তামিম শায়খুল হাদীছ আল্লামা নুরুল ইসলাম আদিব। বৃহত্তর নোয়াখালী, চট্রগ্রাম ও কুমিল্লা সহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় তিন হাজার গাড়ি যোগে তার ভক্ত অনুরাগীরা জানাজায় উপস্থিত হন। মাদ্রাসা মাঠ কয়েকটি ভবনের ছাদ এবং ওলামাবাজারে জানাজায় উপস্থিত মানুষের তিল ধারণের ঠাই ছিলনা। সবাই যেন শোকে বিহ্বল। কি যেন হারিয়ে সবাই হাউমাউ করে কাঁদছে। সবাই যেন একজন অভিভাবককে হারিয়ে ফেলেছেন। একজন হক্কানী আলেমের বিদায়ে সোনাগাজীবাসী যেমনী একজন অভিভাবক হারিয়েছেন, তেমনি দেশেরও হয়েছে অপূরণীয় ক্ষতি। দেশবাসী হারিয়েছেন একজন ইসলামী চিন্তাবিদকে। ঘোটা মুসলিম সমাজে যেন তার মত একজন আলেমের শূন্যতা বিরাজ করছে। উপমহাদেশে হাতেগোনা কয়েকজন ইসলামী বিজ্ঞ আলেমের মধ্যে আল্লামা ছায়্যেদ আহমদ ছিলেন অন্যতম একজন আলেম।
দলমত নির্বিশেষে সোনাগাজীর সব মানুষের অভিভাবক ছিলেন বড় হুজুর হিসেবে পরিচিত আল্লামা ছায়্যেদ আহমদ। তিনি নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের এক মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। কাওমী বিভাগে বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় শিক্ষা জীবন শেষ করে নিজ দেশে এসে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন তিনি। ১৯৪৬ সালে দারুল উলুম আল হোছাইনিয়া ওলামা বাজার মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠার ৩/৪ বছর পর ইসলামী শিক্ষার মহান ব্রতি নিয়ে এ মাদ্রাসায় কর্ম জীবন শুরু করেন তিনি। দাপে দাপে সফল ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে প্রায় ২৭ বছর পূর্বে এ মাদ্রাসার মুহতামিম হিসেবে দায়ীত্ব পেয়ে আমৃত্যু এ মাদ্রাসার মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সততা, দক্ষতা ও সুনামের সাথে দায়ীত্ব পালন করেন তিনি। প্রায় ৭০ বছরের কর্মজীবনে তার কোন দুর্ণাম ছিলনা। নির্লোভ, নিঃসার্থ, সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয়। এ মাদ্রাসায় বর্তমানে ১হাজার ৭০৫জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত এবং ৫০ জন শিক্ষক -কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। একজন আদর্শ সংগঠক ও সফল রাজনীতিবিদ ছিলেন মাও. ছায়্যেদ আহমদ। একজন সৎ মানুষ হিসেবে কর্মজীবনে সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতেন তিনি। সবার শ্রদ্ধার পাত্র হিসাবে তার প্রতি ছাত্র-শিক্ষকদের ছিল অকৃত্রিম শ্রদ্ধা আর ভালবাসা। তার ছাত্র ও সহকর্মীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, তিনি মাদ্রাসার অনুদান সংগ্রহে যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমন করতেন, তখন মাদ্রসার তহবিল ছাড়া ব্যক্তিগভাবে নিজের জন্য অতিরিক্ত কোন অনুদান গ্রহণ করতেননা। উপহার হিসেবে যে অর্থ পেতেন সেগুলো দেশে দারিদ্র মানুষদের মাঝে বিলি করে দিতেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে যখন ওয়াজ করতে যেতেন, তখন গণপরিবহন অথবা ছোট গাড়ি করে সামান্য খরচে যাতায়াত করতেন। বেশি খরচে একক ভাবে ভাড়া গাড়ি নিয়ে কোন মাহফিলে যেতেননা। মাহফিলে গিয়ে যৎসামান্য যাতায়াত খরচ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে কোন পারিশ্রমিক নিতেননা। ভক্ত অনুরাগীদের কাছ থেকে পাওয়া হাদিয়া মাদ্রাসার তহবিলে অকাতরে দান করে গেছেন তিনি। হযরত মুহাম্মদ সা. এর জীবনাদর্শ অনুস্মরণ ও অনুকরণ করে জীবন যাপন করতেন তিনি। অছরের নামাজ পড়তে গিয়ে মসজিদে প্রবেশ করে এশার নামাজ শেষ করে কর্মস্থলের আবাসে যেতেন। রাতের আহার শেষে রাত ২টা/৩টা পর্যন্ত মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিনের সন্তুষ্টি লাভের জন্য ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল থাকতেন। সকালে ফজরের নামাজের পর ইশরাকের নামাজ আদায় করে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে আবার দিনের কর্ম দিবস শুরু করতেন। তার প্রিয় কর্মস্থল এ মাদ্রাসাটিকে এত ভালবাসতেন বিগত প্রায় ২০/২৫ বছর যাবৎ মুসলমানদের পবিত্র দুটি ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনেও নিজের কর্মস্থল ছেড়ে বাড়িতে যেতেননা। পরিবারের সদস্যদের মায়া ত্যাগ করে প্রিয় কর্মস্থলের শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের নিয়ে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতেন। নিজের সন্তানদের চেয়েও বেশি ভালবাসতেন তার প্রিয় এ মাদ্রাসাটিকে। হযরত হাফেজ্জী হুজুর (র.) ও ভারতের মাও. আবরারুল হকের খলিফা ছিলেন তিনি। তারও প্রায় ৮০ জন খলিফা ছিলেন। তম্মধ্যে কিছু জীবিত আছেন কিছু

মারা গেছেন। রাজনৈতিক জীবনে একজন আদর্শ সংগঠক ও সফল ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। হাফেজ্জী হুজুরের জীবদ্দশায় তিনি খেলাফত আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং সফল হয়েছেন। মরহুম হোসেন আহম্মদ মাদানী, শায়খুল আদব (র.), হাকিমুল ইসলাম ক্বারী তৈয়ব (র.) এবং মাও. ইব্রাহীম বিলীয়বী (র.) ছিলেন তার ওস্তাদ। তিনি কর্মজীবনে দেশের বহু মাদ্রাসার শূরা সদস্য ছিলেন এবং সফলতার সাক্ষর রেখেছিলেন। তিনি আমৃত্যু ফেনী জেলা তানজীমুল মুদারিছিন কাওমিয়ার সভাপতি ছিলেন। এত বড় বজুর্গ আলেমে দ্বীন হওয়া সত্বেও তিনি নিজেকে সবসময় আড়ালেই রাখতেন এবং নিজেকে ছোট করে দেখতেন। দীর্ঘ ৭০/৮০ বছরের কর্মজীবনে তার হাতে গড়া শিক্ষার্থীরা আজ দেশ-বিদেশে কর্মজীবনে সফলতার সাক্ষর রেখে চলেছেন। এত সুদীর্ঘকালের একজন মানুষ গড়ার কারিগর কখনো অহঙ্কার করতেননা। পারিবারিক জীবনেও ছিলেন তিনি একজন সফল ব্যক্তিত্ব। মৃত্যুকালে তিনি তিনজন হাফেজ ছেলে সহ অসংখ্যগ্রাহী রেখে গেছেন। তার তিন ছেলেই দেশের স্বনামধন্য আলেম হিসেবে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সমাদৃত রয়েছেন। তার স্ত্রীও ছিলেন দাওরায়ে হাদীছ অর্থাৎ ধর্মীয় উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত একজন নারী। তিনিও বেঁচে নেই। পরিবারের সদস্যদের সম্মতিতে তার প্রিয় কর্মস্থলের পাশের কবরাস্থানে আলোকিত বজুর্গ এ আলেমকে চিরনিন্দ্রায় শায়ীত করা হয়েছে। গত ২৪ নভেম্বর রাত ৯টার দিকে হার্ট স্ট্রোক করলে তাকে প্রথমে ফেনী এবং ২৫ নভেম্বর তাকে রাজধানীর শমরিতা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ৪ ডিসেম্বর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কারো কারো মতে তিনি প্রায় ১১০ বছর বয়সে মারা গেছেন। তার মৃত্যতে পুরো ফেনী জেলায় শোকের ছায়া নেমে আসে। এদিকে মাদ্রাসার মজলিশে শূরা সদস্যদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সোনাগাজীর আমিরাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের কৃতি সন্তান শায়খুল হাদীছ আল্লামা নুরুল ইসলাম আদিবকে মাদ্রাসার মুহতামিম নিযুক্ত করা হয়ছে। এছাড়া আবদুল্লাহ আবু নাছেরকে মাদ্রাসার শিক্ষা পরিচালক নিযুক্ত
করা হয়েছে। fb_img_1480857833591