সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সঙ্কটে স্বাস্থ্য সেবা ব্যাহত

আপডেট : November, 17, 2018, 9:24 am

 

জাবেদ হোসাইন মামুন->>>

ফেনীর সোনাগাজীর ৫০ শয্যার হাসপাতালে চিকিৎসক সঙ্কটের কারণে জনগণ প্রাপ্য স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে স্থানীয় জনগণের অভিযোগ। প্রায় ৪লাখ লোকের বসবাস এই উপজেলায়। উপকূলীয় উপজেলা হিসেবে স্বাস্থ্য সম্পর্কেও তেমন একটা সচেতন নয় এই জনপদের মানুষ। প্রতিদিন গড়ে আন্ত:বিভাগে ৫০/৬০ জন এবং বহির্বিভাগে ৩০০/৪০০ জন রোগী এই হাসপাতালে স্বাস্থ্য সেবা নিতে আসে। হাসপাতালে ২৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও রয়েছে মাত্র ৫ জন। ৫ জন চিকিৎসকের মধ্যে মনিজা করিম নামে একজন চিকিৎসক বিনা ছুটিতে প্রায় দুই মাস যাবৎ কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছে। বাকি চার জন চিকিৎসকের মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. নূরল আলম ও মেডিক্যাল অফিসার নাসরিন আক্তার ছাড়া অন্য বাকি দুইজন চিকিৎসক নিয়মিত হাসপাতালে আসেননা। সকাল ৯টার মধ্যে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তারা অনিয়মিতভাবে কর্মস্থলে আসেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছেন। কার্যত দুই জন চিকিৎসক দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে স্বাস্থ্য সেবা।
কখনো কখনো দুই দিনেও চিকিৎসকের দেখা পাননা আন্ত: বিভাগের রোগীরা। নার্স ও স্বাস্থ্য সহকারিদের উপর নির্ভর করতে হয় রোগীদের।
বহির্বিভাগেও একই অবস্থা। স্বাস্থ্য সহকারিরা রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে চরম হিমসিম খেতে হচ্ছে। এছাড়া জরুরী বিভাগে একজন মেডিকেল অফিসার নিয়মিত থাকার কথা থাকলেও সেখানেও একজন স্বাস্থ্য সহকারি ও একজন সুইপারই একমাত্র ভরসা। গত এক মাসেও আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার নির্ধারণ করা হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধুমাত্র উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নূরুল আলম ছাড়া অপর ৪ জনই নারী চিকিৎসক। তারা কেউ জেলা সদরে আবার কেউ চট্রগ্রামে বসবাস করেনন। তাই আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে কাউকে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া নারী চিকিৎসকেরা হাসপাতালে থাকতে চায়না বলে তারা অন্যত্র থেকে এসে নিজেদের ইচ্ছামত কর্মস্থলে আসেন। নিয়োগকৃত চিকিৎসকদের মধ্যে দুইজন গাইনি কনসালটেন্ট। তারা নিজেদের ইচ্ছামত কর্তব্য পালন করেন। কারণ তাদের এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার একই পদ মর্যদার হওয়ায় তিনি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া বা কর্তৃত্ব করার সুযোগ থাকেনা।
২০১২ সালে ৩১ শয্যা থেকে উন্নীত হয়ে ৫০ শয্যা হাসপাতালে পরিণত করা হলেও হাসপাতালটি এখনো ৩১ শয্যার জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামে চলছে। ২০১৭ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে ৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে চালু হলেও এখন পর্যন্ত ৫০ শয্যার জনবল বা চিকিৎসা সরাঞ্জাম মিলেনি। এক্সরে মেশিনটি দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ বিকল হয়ে পড়ে আছে। ৫০ শয্যার হাসপাতালে একজন তত্বাবধায়ক, আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার, জুনিয়র কনসালটেন্ট, শিশু ও গাইনি কনসালটেন্ট, মেডিক্যাল অফিসার, মেডিসিন, সহকারি সার্জারি ও ডেন্টাল সার্জন সহ ২৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা রয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসক সঙ্কটের কারণে রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি থেকেও বাহির থেকে বিভিন্ন চেম্বার বা ক্লিনিকের চিকিৎসকের সরানাপন্ন হচ্ছেন। হাসপাতালে ভর্তি বাখরিয়া গ্রামের দুই বছর বয়সি শিশু মেহেদি হাসান নামে হাসপতালে ভর্তিকৃত এক শিশুর মা জানান, দুই দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসক না পেয়ে শিশু বিশেজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যবস্থা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। এদিকে বিভিন্ন প্রশাসনিক বা দাফতরিক কাজে ব্যস্ত থাকেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা। এরপরও রোগীদের আহাজারিতে তিনি সকাল-বিকাল রোগী দেখে হাঁফিয়ে উঠেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসকদের পদায়নের পর প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও চাকুরী করার মানসিকতা থাকতে হবে। কিন্তু বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তাদেরকে এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পদায়নের পর তারা কিছু দিন চাকুরী করে। পরে তদবির করে অথবা পেশাগত বিভিন্ন প্রশিক্ষণের অজুহাতে অন্যত্র বদলি হয়ে চলে যান।
সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নূরুল আলম জানান, ৫০শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল হলেও এখনো সে তুলনায় জনবল ও চিকিৎসা সরাজ্ঞাম সরবরাহ করা হয়নি। ফলে চিকিৎসা দেয়ার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা।
এ ব্যাপারে ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির জানান, দীর্ঘদিন থেকে ফেনীর বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকট চলছে। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। নতুনভাবে একজন চিকিৎসক পদায়ন করা হয়েছে। ৩৯ তম বিসিএস এ উত্তীর্ণ চিকিৎসকেরা যোগদান করলে সহসা সঙ্কট কেটে যাবে।

জাবেদ হোসাইন মামুন
০১৮১৮৩৪৭৫২১