সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম শাহবাগ থেকে গ্রেফতার, পরিবার ও বাদীর সন্তোষ, সেই আদালতেই সোপর্দ করা হবে

আপডেট : June, 16, 2019, 7:56 pm

জাবেদ হোসাইন মামুন->>>
ফেনীর সোনাগাজী মডেল থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ২০ দিন পর ১৬জুন রবিবার দুপুরে রাজধানীর শাহবাগ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদিকে তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পুলিশ ডিপার্টমেন্টের প্রতি ধন্যবাদন কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন মামলার বাদী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। তিনি বলেন ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতারের মাধ্যমে পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ভাবমূর্তি উজ্জল হয়েছে। বাংলাদেশের সব থানা থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে। নুসরাত হত্যার ঘটনায় সারা দেশে যেভাবে আওয়াজ উঠেছে, প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সেভাবে আওয়াজ তুললে বাংলাদেশে আর কেউ অন্যায় করবেনা। জনগণের কাছে পুলিশের গ্রহনযেগ্যতা বেড়ে গেছে।
নুসরাতের ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান জানান, ওসি মোয়াজ্জেম কে গ্রেফতারের মাধ্যমে আমার বোন নুসরাত হত্যার প্রকৃত বিচার পাবো বলে আমরা আশাবাদী।
নুসরাতের মা ২৭মার্চ য়োন হয়রানির মামলার বাদী শিরিন আক্তার জানান, ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতারের জন্য যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আমি যখন দেখা করেছিলাম, তখন তিনি আমাকে ন্যায় বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি কথা দিয়ে কথা রেখেছেন। ওসি মোয়াজ্জেম গ্রেফতারের মাধ্যমে আমি আমার মেয়ে হত্যার ন্যায় বিচার পাবো বলে আশাবাদী। মোয়াজ্জেম কে পুলিশ হিসেবে যেন বাড়তি কোন সুবিধা না দিয়ে দ্রুত বিচারের মাধ্যমে তার শাস্তি কার্যকর চাই। তাকে যেন একজন অপরাধী হিসেবে বিচার করা হয়। তিনি বলেন ২৭ মার্চ আমি সকাল সাড়ে ১০টায় থানায় গিয়ে রাত সাড়ে আটটায় মামলা দায়ের করে ফিরে আসি। সেইদিন তার কক্ষ থেকে আমার মেয়ের দুই বান্ধবীকে একটি কক্ষে এবং আমাকে আরেকটি কক্ষে বসিয়ে রেখে ওসি মোয়াজ্জেম তার অফিসে আমার মেয়ের বক্তব্য রেকর্ড করে। তখনও আমার মেয়ে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিল। ওসি মোয়াজ্জেম অধ্যক্ষ সিরাজ ও নুসরাতের খুনিদের দ্রুত শাস্তি চাই। ডাক্তার দেখার আগেই ওসি মোয়াজ্জেম কিভাবে আমার মেয়েকে আত্মহত্যা বলে প্রচারের চেষ্টা করেছেন, সেটাতেই প্রমাণিত হয় ওসি মোয়াজ্জেমও খুনের সাথে জড়িত এবং আগে থেকেই তিনি জানতেন।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্যরিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন এবং পুলিশ ডিপার্টমেন্টের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন নিহত মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির বড় ভাই হত্যা মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমান। তিনি তাকে গ্রেফতারে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম তার কক্ষে আমার বোনের যৌন হয়রানির ঘটনায় ভিডিও ধারন করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং বিব্রতকর। তাকে গ্রেফতারের মাধ্যমে পুলিশের ভাবমূর্তি বেড়ে গেছে। আমার পরিবারের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্যারিস্টার সুমন ও পুলিশ ডিপার্টমেন্টের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি, মিডিয়া) সোহেল রানা সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর থেকেই অভিযান চালিয়েও মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ফেনী ও ঢাকায় বারবার অভিযান চালিয়েও খুঁজে পাওয়া যায়নি তাকে। ফেনী জেলা পুলিশ ঢাকায় এসেও অভিযান চালিয়েছে। তবে মোয়াজ্জেমের কোনো হদিস তারা বের করতে পারেনি। ডিএমপির রমনা জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার মারুফ সর্দার জানান, গ্রেফতারী পরোয়ানার ভিত্তিতে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারী পরোয়ানা যেহেতু সোনাগাজী থানায় রয়েছে। সেহেতু তাকে ফেনীর সোনাগাজী থানায় হস্তান্তর করা হবে। ইতোমধ্যে সোনাগাজী মডেল থানার পুলিশ মোয়াজ্জেমকে গ্রহন করতে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেছেন।
এ ব্যপারে সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মঈন উদ্দিন আহম্মদ বলেন, সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশের একটি দল ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন। গ্রেফতারী পরোয়ানার কাগজপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতে ওসি মোয়াজ্জেমকে সোপর্দ করা হবে।
উল্লেখ্য, ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে তার মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের নামে নুসরাতের বক্তব্য ভিডিও ধারণ করেন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। পরে সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েও দেন তিনি। ভিডিও করে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গত ১৫ এপ্রিল ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ ও মামলার নথি পর্যালোচনা করে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন গত ২৭ মে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।
এদিকে, পুলিশ সদর দফতরের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী, গত ৮ মে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে তিনি রংপুর রেঞ্জ অফিসে যোগ দেন। যদিও সেই ভিডিও তার মোবাইল থেকে চুরি করেছে এমন অভিযোগ এনে সময় টিভির ফেনীর স্থানীয় রিপোর্টার আতিয়ার হাওলাদার সজলের বিরুদ্ধে গত ১৪ মে সোনাগাজী মডেল থানায় মোয়াজ্জেম হোসেন বাদী হয়ে জিডি করেছিলেন। পরে সজলও তার বিরুদ্ধে ফেনী মডেল থানায় একটি জিডি করেছিলেন।
এরআগে, গত ৬ এপ্রিল এইচএসসি সমমানের আলিম আরবি প্রথমপত্রের পরীক্ষা দিতে গেলে দুর্বৃত্তরা নুসরাত জাহান রাফিকে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে গত ১০ এপ্রিল নুসরাত মারা যান।
এ ঘটনায় তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ আট জনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। ১০এপ্রিল মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়ীত্ব দেন আদালত। ২৯ মে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইনের আদালতে মামলার এজাহারভুক্ত আট জনসহ ১৬ জনকে আসামি করে ৮০৮ পৃষ্ঠার চার্জশিট দাখিল করেন পিবিআই কর্মকর্তারা। ১০ জুন আদালত চার্জশীট আমলে নিয়ে ২০জুন চার্জ গঠনের শুনানীর দিন ধার্য করেন।
বিভিন্ন সময়ে এ মামলায় মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা, নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনি, জাবেদ হোসেন, আবদুর রহিম ওরফে শরীফ, হাফেজ আবদুল কাদের ও জোবায়ের আহমেদ, এমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার হোসেন রানা ও মহিউদ্দিন শাকিল সহ ১২ জন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতারের খবর পেয়ে তার দ্বারা নির্যাতিত, নিগৃহিত ও তার অপকর্ম সম্পর্কে মুখ খুলতে শুরু করেছে। চরকৃষ্ণজয় গ্রামের পাখি আক্তার জানান, তার ছেলেকে বিনা অপরাধে গ্রেফতার করে একটি অস্ত্র দিয়ে কারাগারের প্রেরণ করেছে। এখনো সে কারাগারে রয়েছে। আসাদুজ্জামান নামে স্বরাজপুর গ্রামের গাছ ব্যবসায়ী জানান, তাকে আটক করে ৫০হাজার টাকা নগদ নিয়েছে এবং দেড় লাখ টাকার সেগুন কাঠ আত্মসাত করেছে।
মহেশ্চর গ্রামের নুরনবী মেম্বার জানান, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাকে আটক করে তার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা আদায় করেছে। উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের পাটোয়ারি বাড়ির সবুজ নামে এক ব্যক্তি জানান, জমির বিরোধ নিয়ে তার বাড়ির এক থানার দালালের মাধ্যমে একটি কাপড় দোকান থেকেধরে নিয়ে দেড়শ পিস ইয়াবা দিয়ে একটি মিথা মামলা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করে। তিনি আইজিপির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।