নুসরাত হত্যা মামলায় কারাবন্দি আ.লীগ নেতা রুহুল আমিনের মুক্তির দাবীতে পোস্টারিং! যেখানে পোস্টার লাগানো নিষেধ, সেখানেই লাগানো হয়েছে পোস্টার

আপডেট : June, 18, 2019, 5:01 pm

জাবেদ হোসাইন মামুন->>>
ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় কারাবন্দি সোনাগাজী উপজেলা আ.লীগের সভাপতি মো. রুহুল আমিনের মুক্তি দাবী করে সোনাগাজীতে ব্যাপক পোস্টারিং করা হয়েছে। উপজেলার আনাচে কানাছে তার মুক্তির দাবীতে পোস্টারে পোস্টারে চেয়ে গেছে।
যদিও প্রচারে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামীলীগ, সকল সহযোগি ও অঙ্গ সংগঠনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সোনাগাজী উপজেলা আ.লীগ, সহযোগি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ দাবী করেছেন এই পোস্টারিং এর সাথে তাদের দলীয় কোন সম্পর্ক নাই। সোমবার রাত থেকে উপজেলার আনাচে কানাছে প্রচুর পরিমাণে পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। পোস্টারে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি জনাব রুহুল আমিন ভাই এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত মুক্তি চাই। উক্ত পোস্টারগুলো উপজেলা আ.লীগের প্রধান কার্যালয়েও সাঁটানো হয়েছে।
তার মুক্তির দাবীতে পোস্টারিং এর ব্যপারে জেলা আ.লীগের সভাপতি আবদুর রহমান বিকম জানান, তাকে উপজেলা আ.লীগ সভাপতি দাবী করে মুক্তি চেয়ে পোস্টারিং করা ঠিক হয়নি। যারা পোস্টারিং করেছে তারা তাকে সাবেক সভাপতি লেখা উচিৎ ছিল। আমার জানা মতে তার মুক্তির দাবীতে ছাপানো পোস্টারের জেলা বা উপজেলা আ.লীগের কোন সম্পর্ক নাই।
উপজেলা আ.লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক মফিজুল হক জানান, এই পোস্টারিং এর সাথে সোনাগাজী উপজেলা আ.লীগের কোন সম্পর্ক নাই। উপজেলা আ.লীগের সাধারন সম্পাদক এডভোকেট রফিকুল ইসলাম খোকন জানান, পোস্টারিং এর সাথে উপজেলা আ.লীগের কোন সম্পর্ক নাই। সোনাগাজী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আজিজুল হক হিরন ও সাধারন সম্পাদক নূরুল ইসলাম ভূট্টো জানান, পোস্টারিং এর সাথে যুবলীগের কেউ জড়িত নাই। সাংগঠনিকভাবে কাউকে এসব পোস্টারিং এর দায়ীত্বও দেয়া হয়নি।
নুসরাত হত্যা মামলায় গত ২৯মে রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে চার্জশীট প্রদানের পর ৩০ মে জেলা আ.লীগের এক জরুরী সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় উপজেলা আ.লীগের সভাপতি রুহুল আমিন একটি মামলায় কারাগারে থাকায় অধ্যাপক মফিজুল হক কে উপজেলা আ.লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়ীত্ব দেয়া হয়েছে। জেলা আ.লীগের পক্ষ থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছিল।
উল্লেখ্য; গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে একই মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন হয়রানির অভিযোগে মামলা দায়ের করেন তার মা শিরিন আক্তার। ভয়ভীতি দেখানোর পরও মামলাটি তুলে না নেওয়ায় গত ৬ এপ্রিল এইচএসসি সমমানের আলিম আরবি প্রথমপত্রের পরীক্ষা দিতে গেলে অধ্যক্ষের অনুসারীরা নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে গত ১০ এপ্রিল নুসরাত মারা যান।
এ ঘটনায় ৮এপ্রিল তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ আট জনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। ১০এপ্রিল মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়ীত্ব দেন আদালত। ২৯ মে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইনের আদালতে মামলার এজাহারভুক্ত আট জনসহ ১৬ জনকে আসামি করে ৮০৮ পৃষ্ঠার চার্জশিট দাখিল করেন পিবিআই কর্মকর্তারা। ১০ জুন আদালত চার্জশীট আমলে নিয়ে ২০জুন চার্জ গঠনের শুনানীর দিন ধার্য করেন।
বিভিন্ন সময়ে এ মামলায় গ্রেফতারকৃত মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা, নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনি, জাবেদ হোসেন, আবদুর রহিম ওরফে শরীফ, হাফেজ আবদুল কাদের ও জোবায়ের আহমেদ, এমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার হোসেন রানা ও মহিউদ্দিন শাকিল সহ ১২ জন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। গত ২৯ মে চার্জশিটভুক্ত কারাবন্দি আসামি আ.লীগ নেতা রুহুল আমিন, কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, প্রভাষক আবসার উদ্দিন, মো. শামিম, ইফতেখার উদ্দিন, নূর উদ্দিন জামিন চাইলে আদালত তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আ.লীগ নেতা রুহুল আমিন সহ ১৬ জন চার্জশীটভুক্ত আসামি ফেনী করাগারে রয়েছেন।
এদিকে অধ্যক্ষ সিরাজ কর্তৃক নুসরাতের যৌন হয়ারানির ঘটনায় গত ২৭মার্চ থানায় মামলা দিতে গেলে সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন তাকে ধমক দিয়ে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে ব্যরিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বাদী হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে সেটি তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৭ মে পিবিআই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিলে ওই দিনই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। পরোয়ানা জারির দুদিন পর তিনি হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন। ৮ মে তাকে পুলিশের সদর দফতরের এক আদেশে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। গ্রেফতারী পরোয়ানা জারির ২০দিন পর ১৬জুন বিকালে শাহবাগ থানার কদম ফোয়ারার সামনে থেকে ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতার করা হয়। ১৭জুন দুপুরে তাকে বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আস শামস জগলুল হোসেনের আদালতে তাঁকে হাজির করে জামিন আবেদন করেন আইনজীবীরা। তবে শুনানি শেষে তাঁর জামিন নামঞ্জুর করেন আদালত। তাঁকে এরপর কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। ৩০ জুন মামলার পরবর্তী শুনানীর তারিখ নির্ধারন করা হয়।