ফেনীতে ১ বছরে ৬৪ ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন- আলোকিত সময়

আপডেট : January, 20, 2020, 11:25 am

বিশেষ প্রতিনিধি-

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন ছাত্রী নুসরাত জাহান। এ ঘটনায় তাঁর মা শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে মামলা করলে গ্রেপ্তার হন অধ্যক্ষ। মামলা তুলে না নেওয়ায় গত ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে নুসরাতের শরীরে আগুন লাগিয়ে দেন দুর্বৃত্তরা। ১০ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়, যা দেশব্যাপী আলোড়ন তোলে।

এ ঘটনার মতো ফেনীতে গত এক বছরে অন্তত ৬৪টি যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনার অভিযোগে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনায় ৩৭টি ও যৌন নিপীড়নে ২৬টি মামলা হয়েছে। আর যৌতুকের জন্য খুনের মামলা হয়েছে একটি। ফেনীর বিভিন্ন থানায় করা মামলা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সব ঘটনায় মামলা হলে এ সংখ্যা অনেক বেশি হতো বলে মনে করেন স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরা। তাঁদের মতে, সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক ও রুচিবোধের অধঃপতন, আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব এবং মুঠোফোনে অবাধ পর্নোগ্রাফির বিস্তারসহ বিভিন্ন কারণে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা বেড়ে চলছে। এ ছাড়া মাদকের বিস্তারও অন্যতম কারণ বলে মনে করেন তাঁরা।

গত এক বছরে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ ছাড়া নারী ও শিশু অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৩৭টি। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৮টি। জেলায় নারী ও শিশু নিখোঁজের ঘটনায় বিভিন্ন থানায় ১৫টি জিডি করা হয়েছে। ২০১৯ সালে সব মিলিয়ে ফেনী জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মোট ১২৯টি মামলা হয়েছে। ২০১৮ সালে জেলায় মামলার সংখ্যা ছিল ১৭৬টি। ২০১৭ সালে ছিল ১২৪টি।

সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা দাগনভূঞা ও সোনাগাজীতে। মানবাধিকারকর্মীদের ধারণা, এ সংখ্যা আরও বেশি হবে।

বাংলাদেশ মানবাধিকার সম্মিলন ফেনীর চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ধর্ষণের সব ঘটনায় থানায় মামলা হয় না। সামাজিক ও পারিবারিক কারণে অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। তাঁর মতে, জেলায় যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনা আরও বেশি হবে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সারা দেশে ১ হাজার ৭০৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৩৭ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৭৭ জনকে। ধর্ষণের ঘটনায় আত্মহত্যা করেছেন ১৯ জন। ২৪৫ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়।

বেশি সোনাগাজীতে

ফেনীর ছয়টি থানার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে দাগনভূঞা ও সোনাগাজী থানায়। ৯টি করে মামলা হয়েছে এই দুটি থানায়। এ ছাড়া ফেনী সদর থানায় ৭টি, ছাগলনাইয়ায় ৬টি, পরশুরাম থানায় ৪টি এবং ফুলগাজী থানায় ২টি মামলা হয়েছে।

গত এক বছরে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় জেলার ছাগলনাইয়া থানায় ৬টি, ফেনী সদর থানায় ৫টি, দাগনভূঞা থানায় ৪টি, সোনাগাজী থানায় ৫টি, পরশুরাম থানায় ৩টি এবং ফুলগাজী থানায় ৩টি মামলা হয়েছে।

গত এক বছরে নারী নির্যাতন ও যৌতুকের ঘটনায় জেলার ফুলগাজী থানায় ৮টি, ফেনী সদর থানায় ৬টি, দাগনভূঞা থানায় ৪টি, সোনাগাজী থানায় ৪টি, ছাগলনাইয়া থানায় ৪টি এবং পরশুরাম থানায় ২টি মামলা হয়েছে।

অপহরণের ঘটনায় জেলার ফেনী সদর থানায় ১৪টি, ছাগলনাইয়া থানায় ৭টি, সোনাগাজী থানায় ৬টি, পরশুরাম থানায় ৩টি, দাগনভূঞা থানায় ৩টি এবং ফুলগাজী থানায় ৪টি মামলা হয়েছে। ঘটনার শিকার সব ব্যক্তিকে পরে উদ্ধার করা হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মোট ১২৯টি মামলায় ৩০৫ জনকে আসামি করা হয়েছে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ২২২ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে।

ফেনী পুলিশ সুপার খোন্দকার নুরুন্নবী জানান, ফেনীতে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় থানায় মামলা, জিডিসহ অভিযোগ পেলেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে তৎপর হন।