করোনার দুর্যোগেও স্বাস্থ্যবিভাগের টেন্ডারবাজি-লুটপাট চলছেই

আপডেট : June, 20, 2020, 12:27 pm

বিশেষ প্রতিবেদক

বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস কবলিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার চরম মুহূর্তেও স্বাস্থ্য খাতের টেন্ডারবাজি-লুটপাট কোনভাবেই যেন বন্ধ হচ্ছে না। বরং একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা করোনা কেন্দ্রীক ব্যস্ততাকেই দুর্নীতির মোক্ষম সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে চলছে। তারা নানা কায়দা কৌশলে একই প্রতিষ্ঠানের অনুকুলে বারবার কাজ পাইয়ে দেয়ার বিনিময়ে নিজেদের পকেট ভারি করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। দেশে যখন এই প্রাণঘাতী দুর্যোগ মুহূর্তে নিরিলস ভাবে করোনা প্রতিরোধে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। টিক সেই মুহূর্তেই করোনার ফায়দা লুটতেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বেশ কিছু অসাধু চক্র। এই চক্রগুলো এতটাই প্রভাবশালী বনে গেছেন যে দুর্নীতি দমন কমিশনকেও পরোয়া করছেন না তারা।
দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্রষ্টার পরে মানুষের একমাত্র ভরসাস্থল হচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। ইতি মধ্যে দেশে অনেক স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রাণপণ চেষ্টায় করোনা আক্রান্ত রোগিদের মধ্যে সুস্থের সংখ্যা ৫০হাজারে ছুইছুই। এছাড়াও মৃত্যুর হারের তুলনায় সুস্থের হার অনেকই বেশি। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগে চলছে লাগামহীন দুর্নীতি ও লুটপাত। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য খাতের চরম দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চিঠিতে ভয়াবহ অনিয়ম-দুর্নীতি ও জনগণের করের অর্থ লোপাটের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সর্বশেষ ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং সাতক্ষীরার দুটি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সীমাহীন দুর্নীতির তথ্য বেরিয়েও এসেছে।
কতিপয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কাছে অঘোষিত ইজারা প্রদানঃ
অতিসম্প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ওষুধ ও সরঞ্জামাদি সংক্রান্ত সরকারি ক্রয়ের টেন্ডারে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রকাশ্য লুটপাটের ঘটনা সবাইকে হতবাক করে দিয়েছে। শেরপুর জেলার নকলা, নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওষুধ ও সরঞ্জামাদি ক্রয় সংক্রান্ত টেন্ডারে অংশগ্রহণে আগ্রহী ঠিকাদারদের টেন্ডারের ধারে কাছেও ঘেষতে দেয়া হয়নি। শুধুই এক ব্যক্তির মালিকানাধীন তিনটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের দরপত্র ছাড়া আর কোনো দরপত্র গ্রহণ করেনি টেন্ডার কমিটি। ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা জানিয়েছেন, পে-অর্ডার যুক্ত দরপত্রগুলো নিয়ে নির্দ্দিষ্ট দিনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকায় ঢুকতে পর্যন্ত পারেননি তারা। সেখানে ওই তিনটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ভাড়াটে অস্ত্রবাজ সন্ত্রাসীরা অন্য সব ঠিকাদারের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়। যারা দরপত্র জমা দিতে চেষ্টা করেন অস্ত্রের মুখে তাদের কাছ থেকে দরপত্র ও পে- অর্ডারগুলো ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ঠিকাদারের দরপত্র ও পে-অর্ডার ছিনতাই করে নেয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিত অভিযোগ করা হয়। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় নকলা থানায় অভিযোগ পর্যন্ত করা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী সজিব আল হাসানের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, নির্ধারিত দিনে নকলা স্বাস্থ্য কমপেক্সে টেন্ডার জমা দিতে গেলে তিনটি লাইসেন্সের দরপত্র ও এনআরবিসি (ধানমন্ডি শাখা) ব্যাংকের ইস্যু করা ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের ১৮টি পে-অর্ডার ছিনতাই করা হয়। দরপত্র জমা দিতে আসা আব্দুস সবুর রনি বলেন- ঘটনার দিন দুপুরে হাসাপাতাল গেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দরপত্র ও পে-অর্ডার ছিনিয়ে নেয়া হয়। নকলা থানার ওসি জানান, অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রীতিমত টেন্ডার কমিটির লোকজনই ঠিকাদারদের কাছ থেকে দরপত্রগুলো গ্রহণ করে তা গায়েব করে দিয়েছে মর্মেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ফলে ওই দুই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও কেবলমাত্র এক ব্যক্তির মালিকানাধীন তিনটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের দরপত্র জমা পড়েছে এবং তাদের অনুকুলেই সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত ওয়ার্ক অর্ডার প্রদানের প্রক্রিয়া চলছে জোরেসোরে। ভুক্তভোগী ঠিকাদারসহ শেরপুর জেলা সিভিল সার্জন দপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট তিন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান গত নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে শেরপুর জেলার স্বাস্থ্য ও হাসপাতাল সংক্রান্ত সকল টেন্ডার দখল করে আসছে। তাদের বাইরে অন্য কারো ঠিকাদারী করার সুযোগ নেই বললেই চলে। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে লোটাস সার্জিক্যাল, প্রান্তিক এন্টারপ্রাইজ ও আজমীর ইন্টারন্যাশনাল।
অনুসন্ধানকালে জানা যায়, শেরপুর জেলা পরিষদের সাবেক এক চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির মালিকানাধীন ওই তিন প্রতিষ্ঠান ২০০৯ সালে প্রথম শেরপুরে স্বাস্থ্য বিভাগের স্থানীয় পর্যায়ের টেন্ডারে অংশ নেয়। এরপর থেকে আর তাদের পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০ লাখ টাকা থেকে শত কেটি টাকার টেন্ডার কাজ সবই তাদের কব্জায় চলে যায়। মোট কথা শেরপুর জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের যাবতীয় কর্মকান্ড ওই তিন ঠিকাদার সংস্থার কাছে যেন অঘোষিত ইজারা দেওয়া হয়েছে। এর আগে শেরপুর সিভিল সার্জন অফিসে প্রায় দুই কোটি টাকার চিকিৎসাসামগ্রী ও আসবাবপত্র কেনার ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সূত্র জানায়, শেরপুরে হাসপাতালে রোগীদের জন্য ৫১ লাখ ৪৩ হাজার টাকার ওষুধ, ৬৪ লাখ ২১ হাজার টাকার সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি, ২৭ লাখ ৬৭ হাজার টাকার চাদর, কম্বল ও ম্যাট্রেস, ২৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকার গজ, ব্যান্ডেজ, তুলা, ৪০ লাখ ৯৫ হাজার টাকার কেমিক্যাল রি-এজেন্ট ও ১১ লাখ ৪৬ হাজার টাকার আসবাবপত্র টেন্ডারের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়।
টেন্ডারে হরিলুট-পাত্তা পাচ্ছে না দুদকঃ
অভিযোগ উঠেছে, একটি সিন্ডিকেট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশে ঢাকার তোপখানা রোডের লোটাস সার্জিকেল এবং প্রান্তিক এন্টারপ্রাইজ নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়। তারাই দাপট খাটিয়ে খুবই নিম্নমানের সামগ্রী সরবরাহ দিলে সার্ভে কমিটির মাধ্যমে বেশ কিছু পণ্য ফেরত নিতেও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করা হয়। এসব বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সুনির্দ্দিষ্ট অভিযোগও দাখিল হয়। পরবর্তীতে দুদক থেকে দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়কে অবহিত করে দুদক। কিন্তু দুদকের সতর্কতা পাত্তা পাচ্ছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। বরং চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ লুটেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর নামেই নানা কায়দা কৌশলে কোটি কোটি টাকার টেন্ডার কাজ পাইয়ে দেয়ার মাধ্যমে কতিপয় কর্মকর্তা আখের গোছাতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। কয়রা ও বাকেরগঞ্জেও অন্তহীন অভিযোগ খুলনার কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওষুধপত্র, সার্জিক্যাল সামগ্রী, প্যাথলজি ক্যামিকেল, আসবাবপত্র সরবরাহ কাজের প্রায় অর্ধ কোটি টাকার কাজের ভাগ বাটোয়ারার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে জেলা সিভিল সার্জন বলেন, কি ভাবে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে তা আমার জানা নেই। ভুক্তভোগী সরবরাহকারীরা জানায়, করোনা ভাইরাসের কারণে সাধারণ মানুষ যখন দিশেহারা, যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় অচল এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ঠিকাদার ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা যোগসাজসে কাজ হাতিয়ে নিচ্ছে। এদিকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সারাদেশ লকডাউন ঘোষণা করতেই বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৩৮ লাখ টাকার টেন্ডার কাজ স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বন্ধুর হাতে তুলে দেয়া হলো। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে’র ৩৮ লক্ষ টাকার এমএসআর মেডিসিন, সার্জিক্যাল সরঞ্জাম, লেলিন সামগ্রী, আসবাবপত্র, কেমিক্যাল রিজেন্ট) ক্রয়ের জন্য সম্প্রতি টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। এতে মাত্র সাতজন ঠিকাদার ফরম সংগ্রহ করলেও স্বাস্থ্য কর্মকর্তার পছন্দের মাত্র তিনজনের ফরম জমা নেয়া
হয়েছে। আবার আবরার এন্টারপ্রাইজের ঠিকাদার নুরুল আলম ও জেড এ ইন্টারন্যাশনালের ঠিকাদার মোঃ জাহিদুল ইসলাম ফরম জমা দিতে গেলেও তাদের ফরম জমা রাখেননি টিএইচও। তাদের অভিযোগ টিএইচও তার পছন্দের একজনকে টেন্ডার পাইয়ে দিতে তিনটি ফরম জমা নিয়েছেন। একাধিক ঠিকাদার বলেন, সরকার বুধবার সারাদেশ লকডাউন ঘোষণা করে সর্বসাধারণের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারী করেন। যে কারণে তারা কেউ ঘরের বাহিরে বের হতে না পারায় ফরম জমা দিতে পারেননি। এসব নিয়ে প্রশ্ন তুললে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ রেজওয়ানুর, তিনি বলেন, আমি আমার সিদ্ধান্তে সব কিছু করেছি। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য বেগম নাসরিন জাহান রতনা বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।